মেসেঞ্জার আড্ডা থেকে চিরন্তন ভালোবাসা

 

---------------------------------------------------------------

একদিন সন্ধ্যার সময় মারুফ হুট করে ফেসবুকের একটা নতুন আড্ডা গ্রুপে যোগ দেয়। গ্রুপটা বেশ জমজমাট ছিল—সবার মধ্যে হাসি-ঠাট্টা, গল্পের ধুম। সেখানেই প্রথম আলিফার সঙ্গে তার কথা হয়।

আলিফার পরিচিতি ছিল চমৎকার—মিষ্টি স্বভাবের, বুদ্ধিদীপ্ত কথোপকথন, আর কথার মাঝে এক ধরনের মায়া ছিল। প্রথম দিনেই মজার একটা ঘটনা ঘটে। আলিফা ভুল করে মারুফকে “আপু” বলে বসে।

মারুফ সঙ্গে সঙ্গে মজা করে বলে ওঠে,

— “আমাকে তোমার কোন দিক থেকে মেয়ে মনে হয়?”

আলিফা একটু লজ্জা পেয়ে উত্তর দেয়,

— “সরি সরি, ভালো মতো খেয়াল করি নাই।”

এই ছোট্ট কথোপকথন থেকেই শুরু হয় তাদের পরিচয়।

দিন যেতে থাকে, আর মেসেঞ্জারের কথোপকথনও গভীর হতে থাকে। ধীরে ধীরে তারা একে অপরের জীবনের অনেক কথা শেয়ার করতে শুরু করে। কখন সকাল থেকে রাত হয়ে যেত, তারা বুঝতেই পারত না।

মারুফ বুঝতে পারে, আলিফার মায়াভরা কথাগুলো শুধু তার মনেই নয়, হৃদয়ের গভীরেও জায়গা করে নিচ্ছে।

একদিন আলিফা নিজেই বলে,

— “আপনার কথাগুলো শুনতে আমার খুব ভালো লাগে।”

মারুফ একটু লজ্জা পেয়ে উত্তর দেয়,

— “আমারও। মনে হয় আমরা যেন আলাদা দুটি মানুষ নই, একটাই গল্পের দুই চরিত্র।”

সেদিন থেকেই তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে ওঠে। সারাদিন মেসেঞ্জারে কথা, একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি, হাসি-মজা—সব মিলিয়ে সুন্দর একটা সময় কাটছিল।

একদিন সাহস করে মারুফ বলে ফেলে,

— “আলিফা, আমি চাই না শুধু মেসেঞ্জারের বন্ধু হয়ে থাকি। আমি জানি না তুমি কাউকে ভালোবাসো কিনা, কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তুমি কি আমাকে তোমার জীবনের সঙ্গী হিসেবে দেখতে পারবে?”

আলিফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুচকি হেসে বলে,

— “আমি তো অনেক আগেই মেনে নিয়েছি, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। আমার উত্তর—হ্যাঁ।”

সেই দিন থেকে তারা শুধু মেসেঞ্জারের সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকেনি। দু’জনেই একসাথে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

কিন্তু জীবন তো সবসময় গল্পের মতো সহজ হয় না।

হঠাৎ একদিন রাতে মারুফ আলিফার স্টোরিতে দেখে, এক ছেলে তাকে রিং পরিয়ে দিচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে। পরে আলিফাকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারে, মাহির নামের এক ছেলের সঙ্গে নাকি তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। এমনকি সেই ছেলের কাছেই তার ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ডও আছে।

আলিফা জানায়,

— “আমি তাকে বিয়ে করতে চাই না… কিন্তু বাসায় অনেক ঝামেলা চলছে।”

এই কথার দুই দিন পর থেকেই আলিফা আর অনলাইনে আসে না।

মারুফ পাগলের মতো অপেক্ষা করতে থাকে। কোনো খবর না পেয়ে একসময় সে তার বন্ধুকে দিয়ে আলিফাদের বাসায় ফোন করায়। সেখান থেকে জানতে পারে—আলিফার বিয়ে হয়ে গেছে।

এই খবর শুনে মারুফের পৃথিবী যেন থেমে যায়। যাকে নিয়ে সে এত স্বপ্ন দেখেছিল, সেই মানুষটাই আর তার জীবনে নেই—এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। তবুও সে আলিফার ভালো থাকার জন্য নীরবে প্রার্থনা করতে থাকে।

তবুও প্রতিদিন একবার হলেও সে মেসেঞ্জারে গিয়ে আলিফার নামটা দেখে আসত।

ঠিক অনেক দিন পর, এক রাতে হঠাৎ করেই সে দেখতে পেল—আলিফা অনলাইনে।

মুহূর্তেই মারুফের বুক কেঁপে ওঠে। হাত কাঁপতে থাকে, চোখ ভিজে যায়। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে সে মেসেজ পাঠায়,

— “তুমি… সত্যিই আলিফা? তোমার তো বিয়ে হয়ে গেছে। কেমন আছো? তোমার স্বামী কেমন আছে?”

আলিফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দেয়,

— “বিয়ে? কার বিয়ে?”

মারুফ অবাক হয়ে যায়। তারপর সে একে একে সব ঘটনা খুলে বলে—স্টোরিতে রিং দেখা, বাসায় ফোন করে বিয়ের খবর পাওয়া, আর তার হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া।

সব শুনে আলিফা উত্তর দেয়,

— “না মারুফ, আমার বিয়ে হয়নি।”

এই কথাটা শুনে মারুফ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

সে দ্রুত জিজ্ঞেস করে,

— “তাহলে এতদিন কোথায় ছিলে? তোমার কোনো খবর পাইনি কেন? একবারও জানালে না?”

আলিফা শুধু ছোট করে উত্তর দেয়,

— “এমনিই… কিছু পরিস্থিতি ছিল।”

এরপর কিছুদিন আলিফা আবার অনলাইনে আসতে শুরু করে। কিন্তু আগের মতো আর কথা বলত না। আগের সেই হাসি, অভিমান, ভালোবাসা—সব যেন কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল।

মাঝে মাঝে অনলাইনে আসত, দু-একটা কথা বলেই আবার হারিয়ে যেত।

মারুফ যখনই জানতে চাইত,

— “কি হয়েছে? এত বদলে গেছো কেন?”

আলিফা শুধু বলত,

— “কিছু না… এমনি।”

দিন যেতে থাকে, আর আলিফা ধীরে ধীরে আরও দূরে সরে যেতে থাকে।

একদিন আবার হঠাৎ করেই সে অফলাইনে চলে যায়। না কোনো বিদায়, না কোনো ব্যাখ্যা।

মারুফ অনেকবার কল দেয়, বারবার চেষ্টা করে, কিন্তু কোনো সাড়া পায় না।

এরপর থেকে অপেক্ষাটাই যেন মারুফের জীবনের অংশ হয়ে যায়। প্রতিদিন সে মেসেঞ্জার খুলে শুধু একটা সবুজ আলো খুঁজে বেড়ায়… এই আশায়, হয়তো কোনো একদিন আবার আলিফা ফিরে আসবে।

কিছু ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, তবুও শেষ হয়ে যায় না। কিছু মানুষ জীবনে না থেকেও হৃদয়ের গভীরে চিরকাল বেঁচে থাকে।

মেসেঞ্জার আড্ডা থেকে শুরু হওয়া এই ভালোবাসার গল্প একসময়ে কষ্টের অধ্যায়ে পৌঁছালেও, মারুফের হৃদয়ে আলিফার জায়গা চিরদিন অটুট থাকে। তাদের স্মৃতিগুলোই তার জীবনের প্রেরণা হয়ে থাকে।

— লেখক: মোঃ মারুফ হোসেন




Comments