হৃদয়ের পাড় ভাঙা ঢেউ
শৈশবের সেই না বলা কথা
জামাল যখন সুমিদের বাড়ির পাশ দিয়ে মাঠে যেত, সুমি তখন কলতলায় দাঁড়িয়ে থাকতো। সুমি চিৎকার করে বলত, "জামাল ভাই, আজ ফেরার পথে শাপলা নিয়ে আসবা?" জামাল শুধু একবার ফিরে তাকিয়ে মুচকি হাসত। সেই হাসির মাঝেই যেন সব উত্তর লুকানো থাকত। বিকেলের রোদে নদীর পাড়ে বসে জামাল যখন বাঁশিতে সুর তুলত, সুমি দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে সেই সুর নিজের মনে গেঁথে নিত।
যৌবনের মোড় ও প্রথম স্বপ্ন
সময় বদলে গেল। জামাল এখন লম্বা-চওড়া যুবক, আর সুমি ডাগর হওয়া এক তরুণী। একদিন বৈশাখী মেলা থেকে ফেরার পথে জামাল সাহস করে সুমির হাতে একটা কাঁচের চুড়ির বাক্স ধরিয়ে দিল। সুমি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। জামাল শুধু বলেছিল, "সুমি, এই চুড়িগুলো যখন তোমার হাতে বাজবে, আমি বুঝব তুমি আমার আশেপাশেই আছো।"
সুমি সেদিন চুড়িগুলো নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল, কিন্তু রাতের আঁধারে যখন জামাল তাদের বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল, সুমি চোরের মতো বেরিয়ে এসে বলল, "চুড়িগুলো তো পরলাম, কিন্তু দাম দিবা কে?" জামাল অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। সুমি ফিসফিস করে বলেছিল, "দাম হলো—সারাজীবন আমার পাশে থাকার ওয়াদা।"
বিচ্ছেদের কালো মেঘ
কিন্তু সুখের দিনগুলো যেন বড্ড ছোট হয়। সুমির বাবা গ্রামের ধনী মাতব্বর, অন্যদিকে জামালের বাবা সাধারণ এক কৃষক। সুমির বাবা যখন জানতে পারল তাদের সম্পর্কের কথা, তখন যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। জামালকে মারধর করা হলো, আর সুমিকে ঘরে বন্দি করে রাখা হলো। সুমির বিয়ে ঠিক হলো অন্য গ্রামের এক জমিদারের ছেলের সাথে।
বিয়ের আগের রাতে সুমি কোনোভাবে জামালের কাছে খবর পাঠালো—"জামাল ভাই, তুমি কি আসবা না আমাকে নিয়ে যেতে? আমি কি তোমার হাতের বদলে অন্য কারো হাতের চুড়ি পরব?"
জামাল সেদিন রাতে কোনো ভয় পায়নি। সে একাই লাঠি হাতে সুমিদের বাড়ির পেছনের আমবাগানে দাঁড়িয়ে ছিল। সুমি চুপি চুপি বেরিয়ে এলো। তারা দুজনে মিলে সেই রাতে রূপোলি নদীর পাড় ধরে পালিয়ে গেল বহুদূর।
কষ্টের এক নতুন শুরু
শহরে গিয়ে জামাল আর সুমির জীবনটা সহজ ছিল না। জামাল রিকশা চালিয়ে বা দিনমজুরি করে যা আয় করত, তা দিয়ে কোনোমতে তাদের ছোট্ট ঘর চলত। সুমি কখনো অভিযোগ করত না। সে জামালের ফেরার অপেক্ষায় লণ্ঠন জ্বালিয়ে বসে থাকত। কষ্টের মাঝেও তারা একে অপরের মাঝে সুখ খুঁজে পেত।
এক রাতে জামাল খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। সুমি তার শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে জামালের মাথায় জলপট্টি দিচ্ছিল আর ডুকরে কাঁদছিল। জামাল দুর্বল গলায় বলল, "সুমি, আমি তো তোমাকে রানী করে রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আজ তুমি এই নরকে কষ্টে আছো।"
সুমি জামালের মুখে হাত দিয়ে বলল, "জামাল ভাই, ভালোবাসা মানে তো শুধু আরাম-আয়েশ নয়। এই যে কষ্টের মাঝেও আমরা একসাথে আছি, এটাই তো বড় রানীগিরি। আমি তোমার রিকশা চালানো হাতটা ধরতেই ভালোবাসি, কোনো জমিদারের সোনা-দানার হাত আমার চাই না।"
দশ বছর পর: ঘরে ফেরা
দশ বছর কেটে গেছে। জামাল এখন শহরে ছোট একটা ব্যবসা করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কোল জুড়ে এসেছে ছোট একটা ছেলে, যে দেখতে ঠিক জামালের মতো। একদিন জামাল সুমিকে বলল, "চলো সুমি, গ্রামে ফিরে যাই। মানুষ কি ভুলতে পারে তার নিজের মাটিকে?"
তারা যখন গ্রামে ফিরল, তখন আর আগের সেই শত্রুতা ছিল না। সুমির বাবা এখন বৃদ্ধ এবং অসুস্থ। মেয়ে আর জামাইকে দেখে তার চোখের জল বাঁধ মানল না। তিনি জামালকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইলেন।
উপসংহার
আজ জামালের নিজের বাড়ি হয়েছে নদীর পাড়েই। বিকেলের রোদে জামাল তার ছেলেকে নিয়ে নদীর ঘাটে বসে থাকে, আর সুমি পাশেই বসে পান সাজে। জামাল আবার সেই পুরনো বাঁশিটা বের করে সুর তোলে। সুমি হাসিমুখে তাকায়। সেই হাসিতে এখন আর কোনো দুঃখ নেই, আছে এক জীবন যুদ্ধ জয় করার তৃপ্তি।

Comments
Post a Comment