শহরটা যখন ঘুমের চাদরে ঢাকা পড়ে, তখন নীলুফার ডায়েরিটা নিয়ে জানালার পাশে বসে। বাইরে ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোটা কুয়াশার সাথে মিলে এক ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি করেছে। আজ ঠিক সাত বছর তিন মাস এগারো দিন হলো আবির নিখোঁজ। না, ও মরে যায়নি। নিখোঁজ মানুষের মৃত্যুসংবাদ আসে না, শুধু আসে দীর্ঘশ্বাসের স্তব্ধতা। নীলুফার জানে আবির ফিরবে না, তবুও সে প্রতি রাতে দরজার ছিটকিনিটা একটু আলগা করে রাখে। যদি কোনোদিন মাঝরাতে কড়া নাড়ে সেই চেনা হাত দুটি?
আবির ছিল এক খ্যাপাটে কবি। তার কলমের খোঁচায় রাজপথ কাঁপত, আবার সেই কলমেই ঝরতো প্রেমের নোনা জল। নীলুফারের সাথে ওর পরিচয় হয়েছিল এক ঝড়ের বিকেলে। লাইব্রেরির কোণায় শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডি নিয়ে দুজনে হাত বাড়িয়েছিল একই বইয়ের দিকে। সেদিন থেকেই ট্র্যাজেডি শব্দটা তাদের জীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যায়।
নীলুফার মাঝেমধ্যে ভাবে, ভালোবাসা আসলে কী? শুধুই কি পাওয়া, নাকি এক সমুদ্র হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা? আবিরের চলে যাওয়াটা ছিল অদ্ভুত। কোনো চিঠি নেই, কোনো মান-অভিমান নেই, শুধু টেবিলের ওপর পড়ে ছিল এক কাপ জুড়িয়ে যাওয়া চা আর অর্ধেক লেখা একটা কবিতা। সেই কবিতার শেষ লাইনটা ছিল— "যাওয়ার বেলায় কিছু রেখে যেতে হয়, আমি না হয় আমার শূন্যতাটুকু তোমাকেই দিয়ে গেলাম।"
বাকি জীবনটা নীলুফারের সেই শূন্যতা হাতড়েই কেটে যাচ্ছে। অফিসের কাজের ভিড়ে, ট্রাফিক জ্যামে, কিংবা বন্ধুদের হাসাহাসির মাঝেও হঠাৎ কোনো একটা মুহূর্ত তাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দেয় সেই পুরোনো দিনগুলোতে। আবিরের গায়ের সেই মেটে সাবানের গন্ধ, ওর হাসলে গালে পড়া সেই টোল—সবই যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু হাত বাড়ালেই সব ধোঁয়া।
মাঝে মাঝে নীলুফার ভাবে এই শহরটা ছেড়ে চলে যাবে। যেখানে কেউ তাকে চেনে না, যেখানে কেউ তাকে প্রশ্ন করবে না— "আবিরের খবর কিছু পেলে?" মানুষের সহানুভূতি বিষের মতো লাগে তার কাছে। তারা বুঝতে চায় না যে, কিছু ক্ষত সারানোর চেয়ে লালন করা বেশি আরামের। নীলুফার সেই ক্ষতটাই লালন করে।
আজ রাতে আকাশটা খুব ভারী হয়ে আছে। বৃষ্টির পূর্বাভাস নেই, কিন্তু বাতাসের ঝাপটায় এক অদ্ভুত হাহাকার মিশে আছে। নীলুফার ডায়েরির পাতায় নতুন একটা লাইন লিখল— "অপেক্ষাটা যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন পাওয়ার ইচ্ছেটা মরে যায়, শুধু থেকে যায় এক নীরব হাহাকার।"
সে জানে কাল সকালেও রোদ উঠবে, লোকে কাজে যাবে, পৃথিবী তার নিয়মেই ঘুরবে। শুধু এই জানালার পাশে বসে থাকা মেয়েটার পৃথিবীটা থমকে থাকবে এক অসমাপ্ত কবিতার শেষ লাইনে। আবির কি কোথাও বসে এখন অন্য কারো জন্য কবিতা লিখছে? নাকি সেও কোনো নীলুফারের অপেক্ষায় ছটফট করছে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো মহাকালও জানে না।
একলা ঘরে নীলুফার শুধু শুনতে পায় দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ। প্রতিটি সেকেন্ড যেন তাকে মনে করিয়ে দেয়, সময় চলে যাচ্ছে কিন্তু স্মৃতিরা জেঁকি বসে আছে। এই স্মৃতির কারাগার থেকে তার মুক্তি নেই, সে মুক্তি চায়ও না। কারণ আবির না থাকলেও, আবিরের দেওয়া সেই তীব্র কষ্টটাই এখন তার একমাত্র সঙ্গী। কষ্টটাই যখন ঘরবাড়ি হয়ে যায়, তখন সুখকে বড় অচেনা আর ভয়ংকর মনে হয়।
রাত বাড়ে। নীলুফার ডায়েরি বন্ধ করে শুতে যায়। বালিশের তলায় রাখা আবিরের সেই আধপোড়া রুমালটা কপালে ছোঁয়ায়। এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ে রুমালের ওপর। কাল হয়তো এই দাগটা শুকিয়ে যাবে, কিন্তু মনের ভেতরের দাগটা? ওটা যে জন্মের মতো খোদাই করা।
গল্পের দ্বিতীয় অংশ: ছায়ার পিছুটান
সকালে অফিসের জন্য বের হওয়ার সময় নীলুফারের নজরে পড়ল দরজার নিচে পড়ে থাকা একটি খাম। কোনো স্ট্যাম্প নেই, প্রেরকের নাম নেই। শুধু কাঁপাকাঁপা হাতে নীলুফারের নামটা লেখা। নীলুফারের বুকটা ধক করে উঠল। হাত কাঁপতে কাঁপতে খামটা খুলতেই দেখল ভেতরে কোনো চিঠি নেই, কেবল একটা ঝাপসা হয়ে যাওয়া সাদা-কালো ছবি।
ছবিতে সাত বছর আগের সেই লাইব্রেরি, যেখানে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। ছবির পেছনে শুধু একটা তারিখ লেখা—আজকের তারিখ। সময়: বিকেল ৫টা।
সারাটা দিন অফিসে নীলুফার একটা ফাইলও ঠিকঠাক দেখতে পারল না। সাত বছর পর কি আবির ফিরে আসবে? নাকি এটা কারো নিষ্ঠুর রসিকতা? মানুষের ভিড়ে নীলুফার বারবার সেই মেটে সাবানের গন্ধটা খুঁজছিল। ঘড়ির কাঁটা যখন পাঁচটার ঘর ছুঁইছুঁই, নীলুফার তখন সেই পুরনো লাইব্রেরির কোণায় দাঁড়িয়ে। জায়গাটা এখন অনেক বদলে গেছে, ধুলোবালি জমেছে বইয়ের তাকে।
হঠাৎ পেছনে কারো পায়ের শব্দ। নীলুফার ঘাড় ফেরাতেই দেখল এক মাঝবয়সী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে মলিন পাঞ্জাবি, চোখে চশমা। না, এ আবির নয়। লোকটা নীলুফারের হাতে একটা পুরনো ডায়েরি ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
"আবির এটা আপনাকে দিতে বলেছিল। সে জানত আপনি একদিন ঠিক এখানে আসবেন।"
নীলুফার রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল, "আবির কোথায়? ও নিজে কেন আসেনি?"
লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। ল্যাম্পপোস্টের আলোটা তখনো জ্বলেনি, গোধূলির ম্লান আলোয় শহরটা কেমন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। তিনি নিচু স্বরে বললেন, "আবির কোনোদিন ফিরবে না নীলুফার। যে মানুষটা নিজের সবটুকু শূন্যতা অন্যকে দিয়ে যায়, তার ফেরার কোনো রাস্তা থাকে না। সে আসলে নিখোঁজ হয়নি, সে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছিল তার কবিতার অন্তরালে।"
নীলুফার ডায়েরিটা খুলল। প্রথম পাতায় আবিরের সেই পরিচিত হাতের লেখা:
"নীলু, আমি কোনোদিন কবি হতে চাইনি, আমি চেয়েছিলাম তোমার গল্পের শেষ লাইন হতে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, শেষ লাইনটা কখনো সুখের হয় না। আমি দূর থেকে তোমাকে দেখতাম, তোমার অফিসের ডেস্কে রাখা সেই আধপোড়া চা, তোমার জানালার পাশে বসে থাকা ওই একাকী ছায়া—সবই আমি দেখেছি। কিন্তু সামনে আসার সাহস হয়নি, কারণ আমি তখন মৃতদের চেয়েও বেশি নিঃস্ব।"
ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে নীলুফার দেখল, গত সাত বছরের প্রতিটি দিন নিয়ে আবির একটা করে কবিতা লিখেছে। প্রতিটি কবিতায় নীলুফারের হাসিকান্নার হিসাব। লোকটা চলে যাওয়ার আগে শুধু বলে গেলেন, "শহরটা যখন ঘুমানোর ভান করে, তখন কিছু মানুষ জেগে থাকে কেবল অন্যের হাহাকার পাহারা দিতে। আবির সেই পাহারাদার ছিল।"
বৃষ্টি নামল। নীলুফার ডায়েরিটা বুকের সাথে চেপে ধরল। সে বুঝল, আবির ফেরেনি ঠিকই, কিন্তু আবির কোনোদিন চলেও যায়নি। সে মিশে ছিল এই শহরের ধুলোয়, ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আর নীলুফারের লালন করা সেই ক্ষতের গভীরে।
বাড়ি ফিরে নীলুফার আজ আর দরজার ছিটকিনিটা আলগা রাখল না। কারণ সে জানে, যাকে সে খুঁজছে, সে তো ডায়েরির এই কালো অক্ষরগুলোর মাঝেই জীবন্ত হয়ে আছে। আবিরের দেওয়া সেই শূন্যতাটুকু আজ আর হাহাকার নয়, বরং এক অদ্ভুত প্রাপ্তিতে রূপ নিল। নীলুফার জানালার পাশে বসে ডায়েরিতে শেষবারের মতো লিখল— "হারিয়ে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়, কোনো কোনো নিখোঁজ হওয়া আসলে অমরত্বের গল্প বলে।"
নীলুফার আর আবিরের এই অসমাপ্ত গল্পটা কি এখানেই শেষ হওয়া উচিত, নাকি আবিরের এই রহস্যময় জীবনের আড়ালে আরও কোনো সত্য লুকিয়ে আছে বলে আপনি মনে করেন?
Comments
Post a Comment