কুয়াশাঘেরা পুরনো কেবিন

 


শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে নির্জন এক গেস্টহাউসে এসে উঠেছিল মারুফ। সে একজন ফ্রিল্যান্স লেখক, নতুন উপন্যাসের প্লট খোঁজার জন্য একটু নিরিবিলি দরকার ছিল তার। গেস্টহাউসটির নাম 'পাহাড়ি কুহক'। ম্যানেজার বৃদ্ধ সোলেমান মিঞা ওকে থাকার জন্য পেছনের দিকে একটা পুরনো কাঠের কেবিন দিলেন। কেবিনটা দেখতে বেশ নান্দনিক, কিন্তু কেমন যেন একটা ঠান্ডা ভাব সবসময় লেগে থাকে সেখানে।

​প্রথম রাতে মারুফ যখন ল্যাপটপে লিখছিল, তখন হঠাত মনে হলো ঘরের কোণে একটা হালকা সুগন্ধ। ঠিক হাসনাহেনার মতো। মারুফ চারদিকে তাকাল, কোথাও কোনো ফুলের গাছ নেই। ও ভাবল, হয়তো মনের ভুল।

​পরের দিন বিকেলে মারুফ কেবিনের বারান্দায় বসে স্কেচ করছিল। হঠাত কানে এল খুব মৃদু গুনগুন শব্দে একটা গান। বাংলা পুরনো দিনের কোনো এক বিষাদমাখা সুর। ও গেস্টহাউসের অন্যদিকে গিয়ে দেখল, ম্যানেজার ছাড়া আর কেউ নেই। সোলেমান মিঞা বললেন, "এহন তো টুরিস্ট কম, বাবা। আপনি ছাড়া আর কেউ নাই এই পাশে।"

​রাত বাড়ার সাথে সাথে কুয়াশাও বাড়তে থাকল। মারুফ ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে দিল। কিন্তু এবার সুগন্ধটা আরও তীব্র হলো। গানের সুরটাও যেন দরজার ঠিক ওপাশ থেকেই আসছে বলে মনে হলো। মারুফের সাহস মন্দ নয়, ও সাবধানে দরজা খুলল।

​দরজার বাইরে, কুয়াশার মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল একটি মেয়ে। পরনে সাদা শাড়ি, চোখে কেমন একটা অদ্ভুত গভীরতা। মেয়েটি হাসল। সেই হাসি দেখে মারুফের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সে কোনো ভয় পেল না, বরং একটা অদ্ভুত আকর্ষণ বোধ করল।

​মারুফ জিজ্ঞেস করল, "আপনি... আপনি কে? এই এত রাতে এখানে কি করছেন?"

​মেয়েটি উত্তর দিল না, শুধু হাতছানি দিয়ে ওকে ডাকল। মারুফ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করল। তারা কেবিনের পেছনের গভীর জঙ্গলের দিকে চলে গেল। কুয়াশার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটি হঠাত থামল। সেখানে একটা পুরনো, ভাঙাচোরা সমাধিস্তম্ভ দেখা যাচ্ছিল।

​মেয়েটি মারুফের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি আসোনি কেন? আমি তো অনেক অপেক্ষা করেছি।"

​মারুফ অবাক হয়ে বলল, "আমি? আমি তো তোমাকে চিনিই না। কার জন্য অপেক্ষা করেছ?"

​মেয়েটি সমাধির গায়ে হাত রেখে বলল, "আমাদের গল্পটা তো শেষ হয়নি, মারুফ। তুমি বলেছিলে, এবার এসে আমাকে নিয়ে যাবে।"

​মারুফের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। 'আমাদের গল্প'? মেয়েটা তার নাম জানল কি করে? হঠাত করে কুয়াশা আরও ঘন হলো এবং মেয়েটি ধীরে ধীরে সেই কুয়াশার মাঝেই মিলিয়ে গেল। মারুফ একা দাঁড়িয়ে থাকল সেই পুরনো সমাধির সামনে।

​পরের দিন সকালে সোলেমান মিঞা এসে মারুফকে খুঁজলেন। ওকে সমাধির কাছে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেল। সুস্থ হওয়ার পর মারুফ ম্যানেজারের কাছে সেই সমাধি সম্পর্কে জানতে চাইল।

​সোলেমান মিঞা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "ঐটা এক অভাগী মেয়ের সমাধি, বাবা। নাম ছিল নীলা। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এই কেবিনেই সে তার প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করত। তার প্রেমিক আসার কথা ছিল, তাকে বিয়ে করে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে আর আসেনি। নীলা এখানেই অপেক্ষা করতে করতে মারা যায়। লোকে বলে, আজও নাকি সে অপেক্ষা করে।"

​মারুফ চমকে উঠল। পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনা! কিন্তু কাল রাতে সে যে মেয়েটিকে দেখল, সে তো একদম তরুণী।

​পরের কয়েকদিন মারুফ আর কেবিনে মন দিতে পারল না। কিন্তু প্রতি রাতে সে সেই সুগন্ধ আর গানের সুর পেত। মেয়েটি, নীলা, আর আসেনি। কিন্তু মারুফ অনুভব করত, নীলা তার আশেপাশেই আছে। তার উপন্যাসের পাতায় হঠাত হঠাত এমন কিছু শব্দ চলে আসত যা সে লেখেনি। যেমন, 'অপেক্ষা শেষ হবে কি?' বা 'তুমি ফিরে আসো'.

​একদিন রাতে মারুফ সিদ্ধান্ত নিল, সে নীলার সাথে কথা বলবে। সে সমাধির কাছে গিয়ে বসল। অন্ধকার রাত, শুধু জোনাকির আলো। ও বলল, "নীলা, আমি জানি তুমি আছো। আমি তোমার প্রেমিক নই, কিন্তু তোমার গল্পটা আমি জানি। তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?"

​কিছুক্ষণ সব নীরব থাকল। তারপর মারুফের ল্যাপটপের স্ক্রিন হঠাত জ্বলে উঠল। কোনো ইন্টারনেট ছাড়াই সেখানে একটা পুরনো ছবি ভেসে উঠল। ছবিতে নীলার সাথে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল, ছেলেটির মুখটা অবিকল মারুফের মতো!

​মারুফ স্তম্ভিত হয়ে গেল। তবে কি... সে নীলার প্রেমিকের পুনর্জন্ম?

​সে রাতে নীলা আর কুয়াশার মাঝে আসেনি, বরং মারুফের স্বপ্নে এসেছিল। স্বপ্নে সে হাসছিল, তার চোখে আর বিষাদ ছিল না। সে শুধু বলল, "ফিরে আসার জন্য ধন্যবাদ।"

​মারুফ বুঝতে পারল, কিছু ভালোবাসা সময় আর মৃত্যুর গণ্ডি পেরিয়েও টিকে থাকে। সে সেই পাহাড়ি কেবিনেই তার উপন্যাস শেষ করল। উপন্যাসের নাম দিল— 'কুয়াশার নীলাঞ্জনা'.

​কেবিন ছাড়ার দিন সোলেমান মিঞা মারুফকে বললেন, "কেবিনটা এবার যেন কেমন শান্ত লাগতেছে, বাবা। আর সেই ঠান্ডা ভাবটাও নাই।"

​মারুফ মুচকি হাসল। সে জানত কেন। নীলার অপেক্ষা শেষ হয়েছে। সে হয়তো মারুফের মাঝে তার প্রেমিকের স্মৃতি খুঁজে পেয়েছে, অথবা মারুফের ভালোবাসার প্রতিশ্রুতির মাঝেই শান্তি পেয়েছে।

মারুফ চলে গেল, কিন্তু সে কেবিনের বারান্দায় একগুচ্ছ হাসনাহেনা ফুল রেখে গেল। কুয়াশায় ঘেরা সেই পুরনো কেবিনে আজও হয়তো মৃদু সুগন্ধ ভাসে, কিন্তু তা আর বিষাদের নয়, বরং এক ভালোবাসার পূর্ণতার সুগন্ধ।

Comments