মায়া-মরীচিকা
১. কুয়াশার চাদর ও একটি পুরনো ট্রাঙ্ক
সকাল ছ’টার দিকে মেহেরপুরের ভৈরব নদীর ওপর যখন হালকা কুয়াশা জমতে শুরু করেছে, তখন নোমানের ঘুম ভাঙল। মে মাসের এই সময়ে সাধারণত এত ঠাণ্ডা থাকার কথা নয়, কিন্তু ভোরের দিকটায় বাতাসে একটা অদ্ভুত হিম ভাব থাকে। নোমান বিছানায় উঠে বসল। পাশেই তার ল্যাপটপটা খোলা, স্ক্রিনে তখনো কয়েকটা জাভাস্ক্রিপ্ট কোডের লাইন জ্বলজ্বল করছে। সারা রাত ঘুমানো হয়নি। ফ্রিল্যান্সিংয়ের একটা প্রজেক্টের ডেডলাইন ছিল আজ।
চোখ দুটো রগড়ে নোমান জানালার বাইরে তাকাল। তাদের এই পুরনো দোতলা বাড়িটার ঠিক পেছনেই একটা মস্ত বড় আমবাগান। বাতাসে কাঁচা আমের গন্ধ ভেসে আসছে। নোমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাট থেকে নামল। ঠিক তখনই নিচের ঘর থেকে একটা ভারী কিছু পড়ার শব্দ হলো।
"ধড়াম!"
নোমান চমকে উঠল। চোর-টোর ঢুকল নাকি? বাবা তো ফজরের নামাজ পড়েই হাঁটতে বের হয়ে যান, মা রান্নাঘরে। শব্দটা এসেছে একদম কোণের অন্ধকার ঘরটা থেকে, যেটাকে সবাই ‘কাচারি ঘর’ বলে।
পা টিপে টিপে নিচে নেমে এল নোমান। কাচারি ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে আছে। ভেতরে আবছা আলোয় দেখা গেল, একটা পুরনো কাঠের আলমারির ওপর থেকে একটা টিনের ট্রাঙ্ক নিচে পড়ে গেছে। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তন্বী। তন্বী নোমানের ছোট বোন, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ছুটিতে বাড়ি এসেছে দুদিন হলো।
"কী করছিস এখানে তন্বী?" নোমান গলাটা একটু নিচু করেই জিজ্ঞেস করল।
তন্বী চমকে উঠে বুকে হাত দিল। "ধুর ভাইয়া! এভাবে ভূত দেখার মতো চমকে দাও কেন? দেখ না, এই ট্রাঙ্কটা মায়ের আলমারির মাথায় ছিল। পেড়ে দেখতে গিয়ে হাত থেকে ফসকে পড়ে গেল।"
নোমান এগিয়ে গিয়ে ট্রাঙ্কটার দিকে তাকাল। লালচে মরিচা ধরা একটা টিনের ট্রাঙ্ক। তালাটা ভাঙা, হয়তো পড়ার আঘাতেই ভেঙে গেছে। নোমান নিচু হয়ে ট্রাঙ্কটার ডালাটা খুলল। ভেতরে কোনো সোনা-দানা বা দামি গয়না নেই। আছে কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠির বান্ডিল, একটা পুরনো ডায়রি যার কভারের চামড়াটা উঠে গেছে, আর একটা বাঁধানো সাদাকালো ছবি।
ছবিটা হাতে নিতেই নোমানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। ছবিতে একটা আঠারো-উনিশ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, পরনে সাধারণ পাজামা-পাঞ্জাবি, চোখে একটা চশমা। ছেলেটার হাসির মধ্যে কেমন একটা চেনা চেনা ভাব আছে, কিন্তু নোমান নিশ্চিত সে এই মানুষকে কখনো দেখেনি।
"এটা কার ছবি রে ভাইয়া?" তন্বী নোমানের কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি দিল।
নোমান উল্টো পিঠে তাকাল। সেখানে পেনসিল দিয়ে অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা—“রুদ্র, ১৯৭১”।
রুদ্র? এই নামে তো তাদের পরিবারে কেউ কোনোদিন ছিল না। তাহলে এই কাচারি ঘরের ট্রাঙ্কে এত যত্ন করে কার স্মৃতি লুকিয়ে রাখা হয়েছে?
২. ডায়েরির পাতা ও নিখোঁজ ইতিহাস
দুপুরের দিকে রোদের তেজ বাড়ল। নোমান তার ঘরের দরজা বন্ধ করে সেই পুরনো ডায়রিটা নিয়ে বসল। ডায়েরির পাতাগুলো এতই জরাজীর্ণ যে একটু জোরে চাপ লাগলেই ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। প্রথম পাতাটা উল্টাতেই চোখে পড়ল গুটগুটে সুন্দর হাতের লেখায় কিছু কথা:
"যদি কোনোদিন এই পাতাগুলো কারো চোখে পড়ে, তবে জেনে নিও—আমি কোনো অপরাধী ছিলাম না। আমি শুধু ভালোবেসেছিলাম। দেশকে, আর একটা মানুষকে। কিন্তু রাজনীতি আর যুদ্ধ আমাদের সব ওলটপালট করে দিল।"
নোমানের কৌতূহল এবার তুঙ্গে। সে পাতা উল্টাতে লাগল। ডায়েরিটা লেখা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে। নোমান পড়তে শুরু করল:
১০ই মার্চ, ১৯৭১
আজও সারা শহর মিছিলে উত্তাল। ঢাকা থেকে খবর আসছে, পরিস্থিতি যেকোনো সময় খারাপ হতে পারে। কিন্তু মেহেরপুরের এই ছোট্ট চত্বরে বসে আমার মন শুধু একজনের কথাই ভাবছে। রাবেয়া। আজ বিকেলে যখন ও নদীঘাট থেকে জল নিয়ে ফিরছিল, ওর শাড়ির আঁচলটা বাতাসে উড়ছিল। আমি দূর থেকে শুধু তাকিয়েই রইলাম, একটা কথাও বলতে পারলাম না। ও কি বোঝে না আমার এই নীরবতার মানে?
নোমান স্তব্ধ হয়ে গেল। রাবেয়া? রাবেয়া তো তার দাদীর নাম! তার দাদী, যিনি আজ পাঁচ বছর হলো মারা গেছেন, যাকে নোমানরা ‘বড় মা’ বলে ডাকত। তাহলে এই রুদ্র নামের ছেলেটি কি তার দাদীর প্রেমিক ছিল? কিন্তু দাদীর বিয়ে তো হয়েছিল নোমানের দাদা মরহুম আমজাদ হোসেনের সাথে, যিনি ছিলেন এলাকার মস্ত বড় ব্যবসায়ী।
ডায়েরির পরের পাতাগুলোয় যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে রুদ্র আর রাবেয়ার এক গোপন ভালোবাসার গল্প ফুটে উঠতে লাগল। রুদ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর মেহেরপুরে নিজের গ্রামে ফিরে এসেছিল মানুষকে সংগঠিত করতে। আর রাবেয়া ছিল গ্রামের এক রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে।
২৫শে মার্চ, ১৯৭১
ঢাকায় নাকি গণহত্যা শুরু হয়েছে। রেডিওতে যতটুকু শুনছি, গা শিউরে উঠছে। আমি আর ঘরে বসে থাকতে পারছি না। আজ রাতে আমাদের এলাকার যুবকেরা মিলে একটা গোপন বৈঠক ডেকেছে। রাবেয়াকে আজ দুপুরে দেখতে গিয়েছিলাম। ও কাঁদছিল। বলল, "তুমি যুদ্ধে গেলে আমি কার ভরসায় থাকব রুদ্র?" আমি ওর হাতটা ধরেছিলাম। এই প্রথম ওর নরম হাতটা ছোঁয়ার ভাগ্য হলো আমার। বললাম, "দেশ স্বাধীন হলে আমি ফিরে আসব রাবেয়া। তখন আর কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না।"
নোমান ডায়েরি থেকে চোখ সরালো। তার মাথার ভেতর একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। যদি রুদ্রই দাদীর জীবনের আসল মানুষ হয়ে থাকে, তবে দাদা আমজাদ হোসেন কে ছিলেন? ইতিহাসের পাতায় কোন সত্যটা চাপা পড়ে গেছে?
৩. এক অদ্ভুত সমীকরণ
বিকেলে নোমান বাজারে গেল। মেহেরপুর শহরের এক কোণায় একটা পুরনো লাইব্রেরি আছে, ‘জ্ঞান বিকাশ কেন্দ্র’। সেখানে খুব নামকরা কয়েকজন বয়স্ক মানুষ বসেন, যারা এলাকার ইতিহাস ভালো জানেন। নোমান ডায়েরিটা একটা ব্যাগে ভরে নিয়ে গেল।
লাইব্রেরিতে ঢুকল নোমান। ভেতরে বইয়ের একটা সোঁদা গন্ধ। কাউন্টারে বসে আছেন সত্তোরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ, নাম শামসুল হক। উনি নোমানের দাদাকে চিনতেন।
"কী হে নোমান? আজ হঠাৎ বুড়োদের আড্ডায়?" শামসুল হক চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে হাসলেন।
নোমান ইতস্তত করে ব্যাগ থেকে সেই সাদাকালো ছবিটা বের করল। "দাদু, একটা জিনিস দেখানোর ছিল। এই ছবিটার মানুষকে কি আপনি চেনেন? এর নাম রুদ্র।"
শামসুল হক ছবিটার দিকে তাকালেন। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। হাতটা একটু কেঁপে উঠল তার। তিনি চশমাটা ঠিক করে নিয়ে ছবিটা আলোর সামনে ধরলেন।
"তুমি... তুমি এই ছবি কোথায় পেলে নোমান?" শামসুল হকের গলাটা কেমন যেন ভেঙে এল।
"আমাদের বাড়ির কাচারি ঘরের একটা পুরনো ট্রাঙ্কে। দাদু, উনি কে ছিলেন? আর আমাদের পরিবারের সাথেই বা ওনার কী সম্পর্ক?"
শামসুল হক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে গলাটা নিচু করলেন। "এই ছবিটা যার, সে ছিল এই এলাকার এক জ্বলন্ত আগুন। রুদ্র আমিন। ১৯৭১ সালে মেহেরপুরের মুক্তিবাহিনীতে ও ছিল অন্যতম সেরা গেরিলা ফাইটার। কিন্তু..."
"কিন্তু কী দাদু?" নোমান অধীর হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"কিন্তু ও কোনোদিন যুদ্ধ থেকে ফেরেনি। সবাই জানত ও শহীদ হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের ঠিক পর পর একটা রটনা রটেছিল যে, ও নাকি দেশের সাথে বেইমানি করেছিল। আর সেই বেইমানির খবরটা মুক্তিবাহিনীকে দিয়েছিল অন্য কেউ নয়... তোমার দাদা, আমজাদ হোসেন।"
নোমান যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার দাদা, যাকে সবাই একজন সমাজসেবক আর ভালো মানুষ হিসেবে চেনে, সে একজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে বেইমানি করেছিল?
"আর একটা কথা নোমান," শামসুল হক বললেন, "রাবেয়া... মানে তোমার দাদী, ও কিন্তু রুদ্রর বাগদত্তা ছিল। রুদ্র নিখোঁজ হওয়ার ঠিক তিন মাস পর, দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগে আগে, তোমার দাদার সাথে রাবেয়ার বিয়ে হয়ে যায়। জোর করেই হয়েছিল কাজটা।"
নোমানের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। এক অন্ধকার অতীত তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যা তাদের পুরো পরিবারের সম্মান আর পরিচিতিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।
৪. অন্ধকারের সূত্রপাত
বাড়ি ফিরে নোমান কাউকেই কিছু বলল না। রাতে ডাইনিং টেবিলে যখন সবাই খেতে বসল, নোমান তার বাবার দিকে তাকাল। তার বাবা, আশফাক আহমেদ, একজন স্কুল শিক্ষক। অত্যন্ত সৎ এবং গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। নোমান ভাবছিল, তার বাবা কি এই ইতিহাস জানেন?
"কী রে নোমান, খাওয়া ছেড়ে কী ভাবছিস?" আশফাক সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
"না বাবা, এমনি। আচ্ছা বাবা, আমাদের কাচারি ঘরের ওই আলমারিটা কতদিনের পুরনো?" নোমান সহজ হওয়ার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল।
আশফাক সাহেব একটু থামলেন, তারপর বললেন, "ওটা তোর দাদার আমলের। কেন বল তো?"
"না, আজ পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা পুরনো ট্রাঙ্ক দেখলাম। ওটার ভেতর কিছু ছেঁড়া কাগজ আর ছবি আছে।" নোমান ইচ্ছে করেই রুদ্রর নামটা নিল না।
আশফাক সাহেবের হাত থেকে ভাতের লোকমাটা প্লেটে পড়ে গেল। তিনি কিছুক্ষণ নোমানের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, "ওসব পুরনো আবর্জনা ঘেঁটে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। কাল ওটা ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করিস।"
বাবার এই আকস্মিক গম্ভীরতা আর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা নোমানকে আরও নিশ্চিত করল—কিছু একটা লুকাতে চাইছে সবাই।
রাতে নোমান আবার ডায়েরিটা খুলল। এবার সে শেষের পাতাগুলোর দিকে গেল। ডায়েরির শেষ এন্ট্রিটা ছিল ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের ২৩ তারিখ।
২৩শে নভেম্বর, ১৯৭১
আজ রাতে আমাদের মিশন। ভৈরব নদীর ওপরের ব্রিজটা উড়িয়ে দিতে হবে। পাকিস্তানি সেনাদের রসদ সাপ্লাই বন্ধ করার এটাই একমাত্র উপায়। আমজাদ ভাই আজ বিকেলে আমাদের ক্যাম্পে এসেছিলেন। উনি বললেন, উনি নিজেই আমাদের গাইড হিসেবে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন, কারণ ওই এলাকার ভেতরের রাস্তা ওনার নখদর্পণে। কিন্তু আমার কেন যেন আমজাদ ভাইকে বিশ্বাস হচ্ছে না। ওনার চোখে কেমন একটা লোভ। রাবেয়াকে যখন আমি শেষবার দেখতে যাই, রাবেয়া বলেছিল আমজাদ ভাই নাকি ওর বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। রাবেয়ার বাবা রাজি হননি। আমার ভয় হচ্ছে, আমজাদ ভাই দেশের চেয়ে নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখছেন না তো? যদি আজ রাতে আমি না ফিরি... রাবেয়া, তুমি জেনে নিও, আমি তোমাকে কতটা..."
লেখাটা এখানেই শেষ। এরপর আর কোনো শব্দ নেই। খাতার পাতায় একটা শুকনো কালচে দাগ—হয়তো রক্তের, কিংবা সময়ের সাথে চটে যাওয়া কালির।
নোমান ডায়েরিটা বন্ধ করে খাটে শুয়ে পড়ল। ঘরের সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে একাত্তরের এক অন্ধকার রাত, ভৈরব নদীর পাড়, আর এক যুবকের বিশ্বাসভঙ্গের গল্প। সে বুঝতে পারল, এই রহস্যের শেষ তাকে দেখতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? রুদ্রর সাথে আসলে কী ঘটেছিল? সে কি সত্যিই মারা গিয়েছিল, নাকি এখনো বেঁচে আছে কোথাও?

Comments
Post a Comment