অপেক্ষার এক শহর
সময়টা ছিল ২০২৩ সালের শেষ দিক। কুয়াশাভেজা সকালে নিলয় যখন প্রথমবার কলেজে পা রাখে, তখন তার সবথেকে প্রিয় সঙ্গী ছিল হাতে থাকা একটা স্কেচবুক। নিলয় কথা কম বলত, তার সব কথা জমা থাকতো পেন্সিলের আঁচড়ে।
এক দুপুরে কলেজের লাইব্রেরিতে বসে সে যখন জানালা দিয়ে আসা রোদের ছবি আঁকছিল, ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়ালো রোদেলা। নামটা যেমন উজ্জ্বল, তার ব্যক্তিত্বও ছিল তেমন। রোদেলা মৃদুস্বরে বলল, "আঁকাটা তো বেশ! কিন্তু এই ছবিতে প্রাণ নেই, একটু হাসি যোগ করলে কেমন হয়?"
সেই থেকে শুরু। নিলয় আর রোদেলার বন্ধুত্ব ছিল এক অদ্ভুত ছন্দের। নিলয় আঁকত আর রোদেলা সেই ছবির পেছনের গল্প শোনাত। একদিন বৃষ্টির দুপুরে নিলয় তার স্কেচবুকটা রোদেলার হাতে দিয়ে বলল, "সব ছবির গল্প তুমি লিখে দাও, আজ আমার একটা না বলা গল্প তুমি পড়ে নাও।"
রোদেলার চোখ গেল শেষ পাতায়। সেখানে তারই একটা ছবি, আর নিচে ছোট করে লেখা— "তুমি আমার ক্যানভাসের সবচেয়ে রঙিন সত্য।"
রোদেলা সেদিন কিছু বলেনি, শুধু নিলয়ের হাতের ওপর আলতো করে হাত রেখেছিল। সেই নীরবতাই ছিল তাদের ভালোবাসার শুরু। তারা স্বপ্ন দেখত—একটু বড় হলে নিলয় তার একটা চিত্র প্রদর্শনী করবে, আর রোদেলা হবে সেখানের প্রধান অতিথি।
কিন্তু সময় সবাইকে পরীক্ষা করে। হঠাত করেই রোদেলার বাবার বদলির খবর আসে। যাওয়ার দিন রোদেলা নিলয়কে একটা চাবির রিং উপহার দিয়ে বলেছিল, "এই চাবিটা আমার কাছে থাকল, আর তালাটা তোমার কাছে। যেদিন আমি ফিরব, সেদিন আমাদের জমানো সব কথা এই তালা খুলে বাইরে আসবে।"
এরপর অনেকটা সময় কেটে গেল। কোনো যোগাযোগ নেই, শুধু নিলয়ের ক্যানভাসগুলো একে একে সাদা থেকে রঙিন হতে লাগল। নিলয় এখন শহরের পরিচিত চিত্রশিল্পী। তার প্রতিটি প্রদর্শনীতে একটি আসন সবসময় ফাঁকা থাকে, সেখানে একটি চাবির রিং রাখা থাকে।
একদিন তার দশম চিত্র প্রদর্শনীর সন্ধ্যায়, ভিড়ের মাঝে একজন মেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে একটা ছবির দিকে তাকিয়ে ছিল। নিলয় কাছে গিয়ে দেখল, মেয়েটির হাতে সেই পুরনো চাবির রিংটা।
মেয়েটি ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছে হাসল। সে আর কেউ নয়, স্বয়ং রোদেলা।
সে ধীর গলায় বলল, "দেরি করে ফেললাম কি?"
নিলয় তার পকেট থেকে সেই পুরনো তালাটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর হেসে বলল, "না, গল্পের আসল অংশটা তো কেবল শুরু হতে যাচ্ছে।"
শেষ হয়েও হলো না শেষ। ভালোবাসা আসলে ফুরিয়ে যায় না, শুধু সঠিক সময়ের জন্য আড়ালে জমা থাকে।

Comments
Post a Comment