অচিনপুরীর ক্যাফে
পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথ যেখানে গিয়ে আকাশের নীল সীমানায় মিশেছে, ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে এক চিলতে কাঠের বাড়ি। ক্যাফে 'অচিনপুরী'। ক্যাফেটি সাজানো হয়েছে সায়ানের নিজের হাতে। পাইন কাঠের দেয়াল, ঝোলানো লণ্ঠন, আর কোণে রাখা একটি পুরনো গ্রামোফোন—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন সময়ের বাইরে কোনো এক জগত।
সায়ান লোকটা অদ্ভুত। সে খুব ভালো কফি বানায়, কিন্তু কারো সাথে খুব একটা কথা বলে না। তার দিন কাটে ক্যাফের বারান্দায় বসে দূরে মেঘেদের খেলা দেখে। তবে ক্যাফের এক কোণে, যেখানে বিকেলের আলোটা তেরছা হয়ে পড়ে, সেই টেবিলটায় সে কাউকে বসতে দেয় না। সেখানে সবসময় একটা সাদা মোমবাতি আর একটা লাল গোলাপ রাখা থাকে। লোকালয়ে রটনা আছে, সায়ান সেখানে কারো অপেক্ষায় থাকে।
সেই রহস্যময়ী আগন্তুক
সেদিন ছিল শ্রাবণের এক তপ্ত বিকেল। হঠাত করেই পাহাড়ের আবহাওয়া বদলে গেল। কালো মেঘে ছেয়ে গেল চারদিক, শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়া। ক্যাফের দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। ভেতরে এল এক তরুণী—ইরা।
তার নীল রঙের রেইনকোট থেকে জল ঝরছে, কাঁপছে তার হাত দুটো। সায়ান দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে এক মগ গরম কফি দিল। ইরা কফিতে চুমুক দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
"পাহাড়ের বৃষ্টি এত সুন্দর আর ভয়ংকর হতে পারে, আগে জানা ছিল না," ইরা বলল।
সায়ান শুধু মৃদু হাসল। সে জানত, এই পাহাড়ে বৃষ্টি মানেই পুরনো কোনো স্মৃতি নতুন করে ধুয়ে মুছে যাওয়া।
সাত দিনের মায়া
পরের সাত দিন ইরা সেখানেই থাকল। সে একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। প্রতিদিন সকালে সে বেরিয়ে যেত ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে, আর সন্ধ্যায় ফিরে এসে সায়ানের ক্যাফেতে বসত। সায়ান লক্ষ্য করল, ইরা খুব অদ্ভুত সব ছবি তোলে। সে পাহাড়ের সাধারণ দৃশ্যের চেয়ে মানুষের চোখের গভীরতা বা পাথরের খাঁজে ফুটে থাকা নাম না জানা ফুলের ছবি বেশি পছন্দ করে।
এক রাতে যখন বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর ভেতরে গ্রামোফোনের মৃদু সুর বাজছিল, ইরা সায়ানকে জিজ্ঞেস করল, "এই কোণের টেবিলটা সবসময় খালি থাকে কেন? এখানে কি কেউ আসবে?"
সায়ান আগুনের কুন্ডের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হাসল। "এখানে একজন বসার কথা ছিল। দশ বছর আগে আমরা দুজনে মিলে এই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম একটা ক্যাফে বানানোর। সে কথা দিয়েছিল, উদ্বোধনের দিন সে প্রথম কফিটা এখানে বসেই খাবে। কিন্তু সময় আমাদের সেই সুযোগ দেয়নি।"
ইরা চুপ করে শুনছিল। সায়ান বলতে থাকল, "সে হারিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমার বিশ্বাস এই ক্যাফের প্রতিটা কোণে সে আজও লুকিয়ে আছে।"
বিচ্ছেদের সুর
ইরা যাওয়ার আগের দিন সায়ানকে বলল, "সায়ান, তুমি খুব সুন্দর একটা জগত তৈরি করেছ। এই পাহাড়, এই মেঘ—সবই তোমার। কিন্তু নিজেকে এই বিষাদের খাঁচায় বন্দি করে রেখো না।"
সায়ান সেদিন রাতে ইরার জন্য বিশেষ এক কাপ কফি বানিয়েছিল। তারা সারা রাত কথা বলল—পুরনো দিনের গান, জীবন আর মানুষের মায়া নিয়ে। ভোরের আলো ফুটতেই ইরা তার ব্যাগ গুছিয়ে নিল। যাওয়ার সময় সে শুধু বলল, "কিছু শেষ আসলে নতুন কিছুর শুরু। বিদায়, সায়ান।"
ডায়েরির পাতায় উন্মোচিত সত্য
ইরা চলে যাওয়ার পর সায়ান যখন ক্যাফে পরিষ্কার করছিল, তখন সে ইরার বসার জায়গাটায় একটা চামড়ার ছোট ডায়েরি পড়ে থাকতে দেখল। নামহীন সেই ডায়েরিটার পাতা উল্টাতেই সায়ানের হৃৎস্পন্দন যেন থমকে গেল।
ডায়েরির প্রথম কয়েক পাতায় সায়ানের অনেক আগের ছোটবেলার ছবি আঁকা। তার নিচে লেখা— "আজ সায়ানকে দেখলাম। সে চিনতে পারেনি। দশ বছর পর তার চেহারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু তার চোখের সেই মায়াটা এখনো আগের মতোই আছে।"
পরের পাতায় লেখা— "সায়ান ভাবছে আমি হারিয়ে গেছি। কিন্তু আমি তো হারাইনি। আমি তো তার চোখের সামনেই ছিলাম। আমি চেয়েছিলাম সে যেন আমাকে ছাড়া বাঁচতে শেখে, নিজের স্বপ্নগুলো একা পূরণ করতে শেখে। সে পেরেছে। আজ আমি শান্তিতে ফিরে যেতে পারি।"
সায়ান পাগলের মতো ক্যাফে থেকে বেরিয়ে রাস্তার দিকে দৌড়ে গেল। কিন্তু কুয়াশা তখন এতটাই ঘন যে হাতের তালুও দেখা যাচ্ছে না। সে চিৎকার করে ডাকল, "ইরা!"
কিন্তু উত্তর এল না। পাহাড়ের প্রতিধ্বনি হয়ে শুধু তার নিজের কণ্ঠস্বরই ফিরে এল।
ভালোবাসার নতুন দিগন্ত
সায়ান ফিরে এল ক্যাফেতে। সে সেই রহস্যময় কোণের টেবিলটার কাছে গেল। এবার সে আর মোমবাতিটা জ্বালাল না। সে বুঝল, ইরা (বা তার সেই পুরনো ভালোবাসা) কখনোই তাকে ছেড়ে যায়নি। সে এসেছিল সায়ানকে মুক্তি দিতে, তাকে বিষাদ থেকে বের করে আনতে।
সায়ান তার ডায়েরিতে নতুন একটা পাতা যোগ করল: "অপেক্ষা এখন আর কষ্টের নয়, অপেক্ষা এখন এক সুন্দর অনুভূতির নাম। কারণ আমি জানি, তুমি আছো—এই পাহাড়ের বাতাসে, এই মেঘের ভাঁজে।"

Comments
Post a Comment