রূপোলি নদীর বাঁকে
শহরের কর্পোরেট জীবনের যান্ত্রিকতা যখন আরিশকে অতিষ্ঠ করে তুলল, তখন সে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই ঢাকা ছেড়ে রওনা দিল নিজের শেকড়ের দিকে। দীর্ঘ দশ বছর পর সে ফিরেছে তার গ্রামের বাড়ি, যেখানে রূপোলি নদীটা এখনো ঠিক আগের মতোই বয়ে চলে।
আরিশ ভাবেনি গ্রামের ধুলোমাখা পথগুলো তাকে এত সহজে চিনতে পারবে। কিন্তু গ্রামের সেই পুরনো বটতলায় পৌঁছাতেই তার মনে পড়ল একজনের কথা। বাঁশরী। তাদের শৈশব আর কৈশোরের সবটুকু স্মৃতি যেখানে জমা হয়ে আছে।
পুরনো সেই দিনগুলো
আরিশ আর বাঁশরী ছিল গ্রামের সবার কাছে 'মানিক-জোড়'। বর্ষার দিনে রূপোলি নদীর পাড়ে কদম তলায় বসে তারা স্বপ্ন দেখত। বাঁশরী বলত, "আরিশ, তুমি যখন বড় সাহেব হবে, তখন আমায় ভুলে যাবে না তো?" আরিশ তখন কিশোর সুলভ জেদ নিয়ে বলত, "নদীর জল কি তার পাড়কে ভুলতে পারে? আমি যেখানেই যাই, এই নদীর টানেই আবার ফিরে আসব।"
কিন্তু আরিশ কথা রাখতে পারেনি। উচ্চশিক্ষার চাপে আর ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড়ে সে বাঁশরীকে চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে যোগাযোগটা মলিন হতে হতে একদিন মুছে গেল।
এক বিষণ্ণ অপরাহ্ণ
গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আরিশ হঠাত থমকে দাঁড়াল। নদীর ঘাটে একজন মেয়ে একা বসে আছে। পরনে সাধারণ সুতি শাড়ি, চুলে একটি বুনো ফুল গোঁজা। আরিশ চিনতে পারল—সেই চিবুকের তিল, সেই শান্ত বসার ভঙ্গি। সে বাঁশরী।
আরিশ কাছে গিয়ে খুব নিচু স্বরে ডাকল, "বাঁশরী..."
মেয়েটি চমকে ফিরে তাকাল। তার চোখের কোণে হঠাত করে বিস্ময় আর এক চিলতে অভিমান ফুটে উঠল। সে কথা বলল না, শুধু স্থির চোখে আরিশের দিকে তাকিয়ে থাকল।
না বলা কথার ভিড়
আরিশ ঘাটের সিঁড়িতে বসে বলল, "ক্ষমা চাওয়ার মুখ আমার নেই, বাঁশরী। আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম তুমি কেমন আছো।"
বাঁশরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "শহরের মানুষগুলো বড্ড অদ্ভুত। তারা ভাবে স্মৃতিগুলো বুঝি পেন্সিলে লেখা, রবার দিয়ে মুছলেই মুছে যায়। কিন্তু এই গ্রাম, এই রূপোলি নদী—এরা তো কিছু ভোলে না।"
সারা বিকেল তারা পাশাপাশি বসে থাকল। কোনো বড় বড় কথা হলো না, শুধু নদীর বয়ে যাওয়ার শব্দ আর দূর থেকে আসা রাখালের বাঁশির সুর। আরিশ জানতে পারল, বাঁশরী বিয়ে করেনি। সে গ্রামের স্কুলে ছোট বাচ্চাদের পড়ায় আর বাবার বাগান দেখাশোনা করে।
ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞা
যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এল। আরিশ যখন ব্যাগ গুছিয়ে স্টেশনের দিকে রওনা হবে, তখন বাঁশরী তাকে একটা মাটির সরা উপহার দিল। তাতে খোদাই করে লেখা— "ফিরে আসা মানেই শেষ নয়, কখনো কখনো শুরু।"
আরিশ ট্রেনের জানালায় বসে ভাবল, সে কি সত্যিই ফিরে যাবে? না কি এই রূপোলি নদীর পাড়েই তার আসল ঘর?
ট্রেন ছাড়ার শেষ মুহূর্তে আরিশ নিজের ব্যাগটা নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ল। সে স্টেশনের মাস্টারের কাছে গিয়ে বলল, "শহরে ফেরার টিকিটটা ক্যান্সেল করুন। আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি।"
উপসংহার
দূর থেকে দেখা গেল, স্টেশনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাঁশরী মুচকি হাসছে। রূপোলি নদীর জল যেমন জোয়ার-ভাটায় বারবার ফিরে আসে, আরিশও তেমনি ফিরে এসেছে তার ভালোবাসার টানে। এবার আর চিঠির জন্য অপেক্ষা নয়, এবার সারাজীবন কদম তলায় বসে সূর্যাস্ত দেখার পালা।

Comments
Post a Comment