কাঁচপোকার নীল দীর্ঘশ্বাস

 


সেদিন আকাশটা ছিল ঠিক তামাটে রঙের। মেহেরপুরের ভৈরব নদীর পাড়ে যখন নীলু এসে দাঁড়াল, তখন বাতাসের ঝাপটায় ওর অবাধ্য চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়ছে। পাঁচটা বছর। দীর্ঘ পাঁচটা বছর ও এই মাটির গন্ধ থেকে দূরে ছিল। শহরের কাঁচঘেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস আর বড় বড় প্রজেক্টের ভিড়ে ও ভুলেই গিয়েছিল যে, বুকের ভেতর একটা পুরনো ক্ষত আজও শুকোয়নি।

​আরিয়ান ছিল ঠিক শরতের মেঘের মতো। কখনো খুব শান্ত, আবার কখনো হঠাৎ বৃষ্টি হয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যেত। ওদের গল্পের শুরুটা হয়েছিল খুব অদ্ভুতভাবে। কলেজের বার্ষিক ম্যাগাজিনে নীলু একটা কবিতা লিখেছিল—'অনামিকা'। সেই কবিতার শেষ চারটে লাইন কে যেন কলম দিয়ে কেটে সেখানে লিখে রেখেছিল, "কবিতাটা সুন্দর, কিন্তু কবির চোখের বিষণ্ণতা ঢাকা পড়েনি।" নীলু রেগে গিয়ে সারা কলেজ খুঁজেছিল সেই ধৃষ্টতা দেখানো মানুষটাকে। অবশেষে লাইব্রেরির সেই কোণের টেবিলটায় ওকে পাওয়া গেল।

​আরিয়ান একটা পুরনো বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে নির্বিকারভাবে বলেছিল, "আমি শুধু সত্যিটা লিখেছি। রেগে গেলে আপনাকে আরও বেশি বিষণ্ণ দেখায়।" সেই রাগ থেকেই পরিচয়ের শুরু, আর সেই পরিচয় কখন যে নিঃশব্দে এক গভীর প্রেমে রূপ নিল, তা ওরা নিজেরাও টের পায়নি।

​ওদের প্রেমটা ছিল চিঠির আর চিরকুটের। আরিয়ান খুব সাধারণ একটা ছেলে ছিল, কিন্তু ওর কথা বলার ধরন ছিল জাদুকরী। ও বলত, "শোনো নীলু, মানুষ মরে গেলে নক্ষত্র হয় কিনা জানি না, তবে আমি যদি কখনো হারিয়ে যাই, তবে আমায় তুমি ওই ভৈরব নদীর ওপারে কাশফুলের দোলায় খুঁজি। আমি বাতাসের সাথে মিশে তোমার কানে কানে বলব—আমি আছি।"

​নীলু হাসত। বলত, "পাগলামি ছাড়ো তো! তুমি কোথাও যাবে না। আমরা একসাথে বুড়ো হব, এই নদীর পাড়েই আমাদের একটা ছোট ঘর হবে।"

​কিন্তু নিয়তি বোধহয় অলক্ষ্যে হাসছিল। নীলুর বাবা-মা ওকে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি পাঠানোর সব ব্যবস্থা করে ফেললেন। যেদিন নীলু যাওয়ার খবরটা আরিয়ানকে দিল, আরিয়ান অনেকক্ষণ চুপ করে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর একটা ম্লান হাসি দিয়ে বলল, "স্বপ্নগুলো অনেক বড় হওয়া দরকার নীলু। তুমি যাও। আমি আছি তো, তোমার এই মেহেরপুরেই আছি।"

​বিদেশের সেই দিনগুলো ছিল নরকের মতো। নীলু দিনরাত পড়াশোনা আর কাজ করত শুধু নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য। আরিয়ানের সাথে প্রতিদিন কথা হতো। আরিয়ান শোনাত মেহেরপুরের বৃষ্টির গল্প, লাইব্রেরির নতুন বইয়ের গন্ধের কথা। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন ছন্দপতন ঘটল। আরিয়ানের ফোনটা বন্ধ পাওয়া গেল। নীলু ভাবল হয়তো নেটওয়ার্কের সমস্যা। কিন্তু দিন গেল, সপ্তাহ গেল, মাস পার হয়ে গেল—আরিয়ানের কোনো খবর নেই।

​নীলু পাগলের মতো ওর বন্ধুদের ফোন করল, কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারল না। সবাই বলল, আরিয়ান নাকি হঠাৎ করেই শহর ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। নীলু ভেঙে পড়ল। ওর মনে হলো, আরিয়ান হয়তো ওকে ভুলে গেছে। হয়তো এই দূরত্ব সহ্য করতে না পেরে ও নতুন কারো হাত ধরেছে। অভিমানে নীলু আর খোঁজ নেওয়া বন্ধ করে দিল। ও জেদ ধরল, ও আর কোনোদিন বাংলাদেশে ফিরবে না।

​কিন্তু জীবনের গতিপথ কেউ আগে থেকে বলতে পারে না। পাঁচ বছর পর বাবার অসুস্থতার খবর শুনে ওকে ফিরতে হলো। মেহেরপুরের সেই ধুলোবালি মাখা রাস্তাগুলো আজ যেন ওকে বিদ্রূপ করছিল। বন্ধুর বিয়েতে যাওয়ার পথে ও যখন সেই পুরনো লাইব্রেরিটার সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, ওর পা দুটো যেন পাথর হয়ে গেল। ভেতরে একটা অদম্য টান অনুভব করল ও।

​লাইব্রেরির ভেতরে সেই চেনা গন্ধ। বইয়ের পাতার ঘ্রাণ। সেই পুরনো লাইব্রেরিয়ান দাদু এখনো আছেন। নীলুকে দেখে তিনি চশমাটা ঠিক করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, "তুমি আসবে আমি জানতাম। সে বলে গিয়েছিল।"

​নীলু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কে? কে বলে গিয়েছিল?"

​বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান নিচ থেকে একটা কাঠের বাক্স বের করলেন। ধুলো ঝেড়ে ওটা নীলুর হাতে দিয়ে বললেন, "আরিয়ান। ও এই বাক্সের ভেতর তোমার পাঁচ বছরের সব উত্তর রেখে গেছে। ও জানত তুমি একদিন ফিরবেই।"

​নীলু কাঁপাকাঁপা হাতে বাক্সটা নিয়ে নির্জন নদীর পাড়ে গিয়ে বসল। বাক্সের ভেতরে ছিল স্তূপীকৃত ডায়েরি আর চিঠির তাড়া। প্রথম ডায়েরিটা খুলতেই ওর চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।

​"আজ ৪ঠা অক্টোবর। নীলু চলে যাওয়ার পর দশটা দিন কাটল। আজ ডাক্তার রিপোর্ট দিল। আমার ফুসফুসে যে ক্যান্সারটা বাসা বেঁধেছে, সেটা নাকি খুব একটা সময় দেবে না। নীলুকে জানানো যাবে না। ও ওখানে স্বপ্ন দেখছে, আমি চাই না সেই স্বপ্নে আমার বিষাদ মাখানো থাকুক। আমি যোগাযোগ কমিয়ে দেব। ও আমাকে ঘৃণা করুক, সেটাই ভালো। অন্তত শোকের চেয়ে ঘৃণা সহ্য করা সহজ।"

​নীলুর হাত থরথর করে কাঁপছিল। পরের ডায়েরিগুলোতে ছিল আরিয়ানের তিল তিল করে মরে যাওয়ার গল্প। প্রতিটি পাতায় নীলুর জন্য আকুলতা।

​"আজ নীলুর জন্মদিন। জানালার বাইরে খুব বৃষ্টি পড়ছে। আমার শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ইচ্ছে করছিল ফোন করে একবার ওর গলাটা শুনি। কিন্তু পারলাম না। নীলু, আমি জানি তুমি আমাকে এখন খুব ঘৃণা করো। কিন্তু বিশ্বাস করো, এই ঘৃণাটাই তোমাকে ওদেশে একা লড়াই করার শক্তি দেবে। আমি তোমার চোখের নোনা জল হতে চাইনি, আমি চেয়েছিলাম তোমার সাফল্যের হাসি হতে।"

​শেষ ডায়েরির শেষ পাতাটা ছিল একদম হলদেটে। সেখানে লেখা ছিল:

"আজ বোধহয় শেষ দিন। আমি মরে গেলে এই ডায়েরিগুলো লাইব্রেরিতে রেখে যাব। আমি জানি নীলু ফিরে আসবে। নীলু, আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম আমি থাকব। আমি আছি। আমি ওই ভৈরব নদীর বাতাসে আছি, আমি ওই লাইব্রেরির বইয়ের পাতায় আছি। যখনই তোমার খুব একলা লাগবে, তুমি চোখ বন্ধ করো। দেখবে আমি তোমার খুব কাছে দাঁড়িয়ে বলছি—আমি তোমাকে ভালোবাসি, সবসময় বেসেছি।"

​নীলুর গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল ডায়েরির ওপর। আরিয়ানের সেই চিরকুটটা মনে পড়ল— "আমি ঝরে পড়ব তোমার জানালার কাঁচে, হয়ে এক ফোঁটা অবুঝ জল।"

​আজ আকাশ থেকে নামা বৃষ্টিটা যেন আরিয়ানের পরশ হয়ে নীলুকে জড়িয়ে ধরল। ও বুঝতে পারল, মৃত্যু কখনো ভালোবাসা কেড়ে নিতে পারে না। আরিয়ান কোথাও যায়নি। ও এই মেহেরপুরের মাটিতেই মিশে আছে। ও নীলুর হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে বেঁচে আছে। দীর্ঘ পাঁচ বছরের জমে থাকা অভিমান এক নিমেষে ধুয়ে মুছে গেল। নীলু নদীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে চাইল, "আমি ফিরে এসেছি আরিয়ান, আমি ফিরে এসেছি!" কিন্তু গলার স্বরটা কান্নায় বুজে এলো।

​চারপাশে অন্ধকার নেমে আসছিল। কিন্তু নীলুর মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের ওপার থেকে আরিয়ান ওর দিকে তাকিয়ে সেই চেনা ম্লান হাসিটা দিচ্ছে। যে হাসিতে কোনো মৃত্যু নেই, আছে কেবল এক অনন্ত প্রতীক্ষার সমাপ্তি। নদীর ওপার থেকে আসা ঝোড়ো হাওয়াটা যেন নীলুর কানে ফিসফিস করে বলে গেল— "আমি আছি।"

Comments