ফেরত খাম
শহরটা যখন জ্যাম আর যান্ত্রিকতায় হাঁপিয়ে ওঠে, ঠিক তখন বড় রাস্তার ধারের পুরনো নীল রঙের পোস্টবক্সটার সামনে এসে দাঁড়ায় ইদ্রিস সাহেব। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। পরনের পাঞ্জাবিটা একটু ঢিলেঢালা, চশমার ফ্রেমটা গত দশ বছরেও বদলানো হয়নি। তার হাতে একটা সাদা খাম। কোনো ঠিকানা নেই, কোনো স্ট্যাম্প নেই। শুধু খামের ওপর লেখা— "রিনিকে।"
রিনি তার মেয়ে। আজ বারো বছর হলো সে অন্য শহরে। না, বিদেশে নয়, বরং এমন এক ঠিকানায় যেখানে কোনো পোস্টম্যান যায় না। ইদ্রিস সাহেব প্রতিদিন এই পোস্টবক্সে একটা করে চিঠি ফেলেন। আশেপাশে লোকে হাসাহাসি করে, কেউ বলে "পাগল", কেউ বা করুণার চোখে তাকায়। কিন্তু তিনি নির্বিকার।
একদিন বিকেলে সেই পোস্টবক্সের কাছে একটা বছর বিশেকের ছেলে বসে ছিল। হাতে গিটার, পরনে ছেঁড়া জিন্স। ছেলেটার চোখেমুখে এক অদ্ভুত জেদ। ইদ্রিস সাহেবকে চিঠি ফেলতে দেখে সে বাঁকা হেসে বলল,
— "দাদু, এই বক্স তো বছর পাঁচেক আগে সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। এখানে চিঠি ফেলে কী হবে? কেউ তো পড়বে না।"
ইদ্রিস সাহেব থামলেন। চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন,
— "পড়বে না জানি রে দাদু। কিন্তু লিখলে বুকটা হালকা হয়। আমরা যখন বড় হয়ে যাই না, তখন কথা বলার লোক কমে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে কথা বলার চেয়ে, এই বোবা বাক্সটাকে মনের কথা বলা অনেক সহজ।"
ছেলেটা একটু থমকে গেল। তার হাতের গিটারটা পাশে নামিয়ে রাখল। আজ সকালে তারও এক প্রিয় মানুষের সাথে বিচ্ছেদ হয়েছে। তার মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা ওখানেই শেষ। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "আপনি রাগ করেন না? সবাই আপনাকে নিয়ে কথা বলে।"
ইদ্রিস সাহেব এবার ছেলেটার কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন,
— "মানুষের স্বভাবই হলো সে যা বোঝে না, সেটাকে নিয়ে হাসাহাসি করা। রিনি চলে যাওয়ার পর আমি প্রথম দুই বছর কারো সাথে কথাই বলিনি। ভেবেছিলাম পৃথিবীটা থমকে গেছে। তারপর বুঝলাম, পৃথিবী ঘোরে তার নিজের নিয়মে, শুধু আমাদের ভেতরে একটা পৃথিবী থাকে যা আমাদের নিজেদের নিয়মে চালাতে হয়। এই চিঠিগুলো আমার সেই বেঁচে থাকার নিয়ম।"
ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর পকেট থেকে একটা পুরনো নোটবুক বের করে এক পাতা ছিঁড়ে কিছু একটা লিখল। কাগজের ভাঁজটা ইদ্রিস সাহেবের খামের সাথে সেই পোস্টবক্সের ভেতরে ফেলে দিল।
সূর্য ডুবছে। আকাশটা আজ গাঢ় বেগুনি। ইদ্রিস সাহেব চলে যাচ্ছিলেন, ছেলেটা পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলল,
— "দাদু, কাল আবার আসবেন তো?"
ইদ্রিস সাহেব না তাকিয়েই হাত নাড়লেন।
সেই রাতে ইদ্রিস সাহেব ডায়েরিতে লিখলেন— "রিনি, আজ তোর জন্য একজন নতুন পাঠক খুঁজে পেয়েছি। হয়তো আমার সব চিঠি তোর কাছে পৌঁছাবে না, কিন্তু এই মরা পোস্টবক্সটা আজ আবার প্রাণ পেয়েছে।"
শহরে জ্যাম কমেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো মিটমিট করে জ্বলছে। কেউ জানল না, এক জন মানুষের জেদ আর এক জন মানুষের দীর্ঘশ্বাস মিলে মিশে এক অন্যরকম বন্ধুত্বের গল্প শুরু হলো সেই অকেজো নীল পোস্টবক্সের সামনে।
কিছু কিছু শূন্যতা আসলে পূর্ণতার চেয়েও দামী। কারণ পূর্ণতায় প্রাপ্তি থাকে, কিন্তু শূন্যতায় থাকে এক অন্তহীন অপেক্ষার মাদকতা।
দ্বিতীয় অংশ: গল্পেরঅপূর্ণ চিঠির উত্তর
পরদিন বিকেলে ছেলেটা আবার এসে বসল সেই পোস্টবক্সের নিচে। তার নাম নীল। কাল রাতে সে ঘুমাতে পারেনি; কেবলই মনে হচ্ছিল, ইদ্রিস সাহেবের মতো কি সেও এক জনম অপেক্ষার মিছিলে সামিল হলো?
ইদ্রিস সাহেব আসলেন। তবে আজ তাঁর হাতে কোনো খাম নেই, বরং তাঁর মলিন মুখে এক টুকরো ম্লান হাসি। নীলের পাশে বসে তিনি বললেন,
— "কাল তুই কী লিখেছিলি রে দাদু?"
নীল মাথা নিচু করে বলল,
— "লিখেছিলাম, যাকে উদ্দেশ্য করে লিখছি সে যেন কোনোদিন এই চিঠিটা না পায়। কারণ সে সুখী হতে চেয়েছিল, আর আমার এই চিঠিতে কেবল অভিযোগের পাহাড়।"
ইদ্রিস সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "অভিযোগও তো এক ধরণের অধিকার। রিনি যখন প্রথম চলে গেল, আমি খুব রাগ করতাম। ঈশ্বরকে গালি দিতাম, পোস্টমাস্টারকে দোষ দিতাম। তারপর একদিন বুঝলাম, নদী যখন সাগরে মেশে, তখন নদীর আর কোনো আলাদা পরিচয় থাকে না। আমাদের প্রিয় মানুষগুলো যখন মহাকালের স্রোতে মিশে যায়, তখন তাদের নিয়ে আমাদের আর অভিযোগ সাজে না।"
হঠাৎ রাস্তার ওপাশ থেকে একটা ট্যাক্সি এসে থামল। সেখান থেকে এক মধ্যবয়সী মহিলা নামলেন। তাঁর চোখেমুখে অস্থিরতা। তিনি সোজা ইদ্রিস সাহেবের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ইদ্রিস সাহেব তাঁকে দেখে একটু চমকে উঠলেন, কিন্তু পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়ে গেলেন।
— "বাবা, তুমি আবার এখানে বসে আছ? সেই পুরনো অভ্যাসটা তো ছাড়লে না?" মহিলাটি ক্লান্ত স্বরে বললেন।
নীল অবাক হয়ে দেখল, ইনিই কি তবে রিনি? কিন্তু ইদ্রিস সাহেব তো বলেছিলেন...।
ইদ্রিস সাহেব নীলের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বললেন,
— "দাদু, একেই বলে জীবনের ট্র্যাজেডি। রিনি তো ফেরেনি, রিনি পাল্টে গেছে। যে রিনিকে আমি চিঠি লিখি, সে ছিল সাত বছরের এক কিশোরী যার চুলে আমি বেণী করে দিতাম। আর এই যে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, এ হলো এক ব্যস্ত মা, যে তার বাবার একাকিত্ব বোঝে না।"
রিনি একটু বিরক্ত হয়ে বলল, "বাবা, বাড়ি চলো। মানুষ হাসাহাসি করছে। এই ডাস্টবিন হয়ে যাওয়া বক্সে চিঠি ফেলে কী পাও তুমি?"
ইদ্রিস সাহেব লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। চিঠির খামটা আজ আর ফেলা হয়নি। তিনি খামটা নীলের হাতে দিয়ে বললেন,
— "আজকের চিঠিটা তুই পড়িস দাদু। আমি আর আসব না। যে মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনুপস্থিত, তাকে আর লিখে কী হবে?"
ট্যাক্সিটা চলে গেল। নীল একা দাঁড়িয়ে রইল সেই নীল পোস্টবক্সের সামনে। সে খামটা খুলল। ভেতরে কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো দীর্ঘশ্বাস ছিল না। শুধু একটা লাইন লেখা ছিল:
"ক্ষমা করে দেওয়াটাও এক ধরণের মুক্তি। আমি তোমাকে মুক্ত করলাম রিনি, আমার অপেক্ষা থেকে।"
নীল বুঝল, ইদ্রিস সাহেব রিনিকে নয়, আসলে নিজেকেই চিঠি লিখতেন এতদিন। সেই বিকেল থেকে পোস্টবক্সটা আর বোবা রইল না। নীল তার গিটারটা হাতে নিয়ে এক অদ্ভুত সুর তুলল। সুরটা বাতাসে ভাসতে ভাসতে যেন বলতে চাইল— কিছু কিছু মানুষ নিখোঁজ হয় না, তারা কেবল আমাদের হৃদয়ের গভীরে এক একটা অসমাপ্ত কবিতা হয়ে থেকে যায়।
শহরটা তখন আবার ঘুমের চাদরে ঢাকা পড়ছে। শুধু সেই পুরনো পোস্টবক্সটা সাক্ষী হয়ে রইল— যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে ত্যাগের গল্পটা ছিল অনেক বেশি সুন্দর।
গল্পের এই মোড়টা কি আপনার মনের মতো হলো? নাকি ইদ্রিস সাহেবের এই ত্যাগের পেছনে আরও কোনো করুণ রহস্য থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

Comments
Post a Comment