নীল জোছনার মায়া
শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে দূরে, সমুদ্রের একদম ধার ঘেঁষে এক নির্জন কটেজে এসে উঠেছে অর্ক। অর্ক পেশায় একজন স্থপতি, কিন্তু ইদানীং তার নকশায় প্রাণের ছোঁয়া হারিয়ে যাচ্ছিল। একঘেয়েমি কাটাতে সে বেছে নিয়েছে এই নির্জন সৈকত। কটেজটির নাম 'সাগর ললিতা'।
প্রথম রাতে বারান্দায় বসে সমুদ্রের গর্জন শুনছিল অর্ক। হঠাত দেখল নীলচে জোছনার আলোয় ভিজে একজন মেয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের খুব কাছ দিয়ে হাঁটছে। মেয়েটির পরনে সাদা শাড়ি, যা বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে। এই নির্জন সৈকতে এত রাতে কোনো মেয়ে একা হাঁটছে দেখে অর্ক কিছুটা অবাক হলো।
কুয়াশাঘেরা পরিচয়
পরদিন দুপুরে কটেজের কাছের ছোট্ট এক চায়ের দোকানে অর্কর সাথে আবার দেখা হলো সেই মেয়েটির। সে সেখানে একা বসে পুরনো একটি বই পড়ছিল। অর্ক কৌতূহল সামলাতে না পেরে আলাপ জমাল। মেয়েটির নাম নীলিমা।
নীলিমা হাসলে তার চোখের কোণে এক অদ্ভুত আভা ফুটে ওঠে। সে বলল, "আমি এই সমুদ্রের পুরনো কথা কুড়াতে আসি। লোকে যা আবর্জনা ভেবে ফেলে দেয়, আমি সেগুলোর মাঝে গল্প খুঁজি।"
সারা বিকেল তারা সৈকতে হাঁটলো। নীলিমা অর্ককে দেখাল কীভাবে ঝিনুকের শব্দে সুর লুকিয়ে থাকে। অর্ক মুগ্ধ হয়ে দেখছিল নীলিমার প্রতিটি কথা যেন একেকটি কবিতা। নীলিমা তাকে একটি নীল পাথর উপহার দিয়ে বলল, "এটি নীল জোছনার পাথর। যদি কখনো হারিয়ে যাও, এটি তোমাকে পথ দেখাবে।"
রহস্যের শুরু
দিন যত যাচ্ছিল, অর্ক নীলিমার মায়ায় জড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু নীলিমা সম্পর্কে সে কিছুই জানতে পারছিল না। সে কোথায় থাকে, কার সাথে থাকে—সবই ছিল অজানা। নীলিমা শুধু সূর্যাস্তের সময় আসত আর জোছনা গাঢ় হওয়ার আগেই মিলিয়ে যেত।
একদিন অর্ক কটেজের কেয়ারটেকার রহমত আলীকে জিজ্ঞেস করল নীলিমা সম্পর্কে। বৃদ্ধ রহমত আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "নীলিমা? সে তো এই সমুদ্রের এক পুরনো দীর্ঘশ্বাস, বাবা। আজ থেকে বিশ বছর আগে এক কালবৈশাখী রাতে সে তার প্রেমিকের অপেক্ষায় এই সৈকতে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই প্রেমিক আর ফেরেনি, আর নীলিমাও কোনোদিন ঘরে ফেরেনি।"
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল। তাহলে সে যার সাথে প্রতিদিন সময় কাটাচ্ছে, সে কে?
এক চূড়ান্ত রাত
সে রাতে নীল জোছনা ছিল অন্যদিনের চেয়ে তীব্র। অর্ক সৈকতে গিয়ে দেখল নীলিমা সেই পুরনো জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। অর্কর হাত কাঁপছিল। সে নীলিমাকে ডাকল, "নীলিমা, তুমি কি আসলেই আছো?"
নীলিমা ফিরে তাকাল। তার চোখে জল, কিন্তু ঠোঁটে সেই মায়াবী হাসি। সে বলল, "অর্ক, ভালোবাসা কখনো মরে না, সে শুধু রূপ বদলায়। তুমি এসেছ বলে আমার বিশ বছরের অপেক্ষা সার্থক হয়েছে। তোমার নকশায় যে প্রাণ খুঁজছিলে, তা আজ থেকে আমার এই স্মৃতিতে খুঁজে পাবে।"
ধীরে ধীরে এক বিশাল ঢেউ এল। নীলিমা সেই ঢেউয়ের ঝাপটায় মিলিয়ে গেল। অর্ক শুধু হাতে ধরে রাখা সেই নীল পাথরটি উজ্জ্বল হতে দেখল।
এক বছর পর
অর্ক এখন দেশের নামকরা স্থপতি। সে একটি অনন্য মিউজিয়াম তৈরি করেছে, যার নাম দিয়েছে 'নীল জোছনা'। মিউজিয়ামটি এমনভাবে তৈরি, যেন সমুদ্রের বাতাস সেখানে সবসময় সুর তোলে। মিউজিয়ামের প্রধান ফটকে রাখা আছে একটি নীল রঙের বড় পাথর।
মানুষ সেই স্থাপত্য দেখে অবাক হয়, কিন্তু কেউ জানে না এর প্রতিটা ইটের ভাঁজে মিশে আছে এক রহস্যময়ী মেয়ের অমর ভালোবাসার গল্প। অর্ক আজও প্রতি পূর্ণিমায় সেই সৈকতে যায়—যদি কখনো আবার দেখা হয় সেই সাদা শাড়ি পরা মেঘবালিকার সাথে।

Comments
Post a Comment